সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিতের ঘোষিত ১২ বাজেট

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আর নেই। শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট উপস্থাপন করেছেন তিনি। ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্ম নেওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৬ ব্যাচের সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে ইকোনমিক কাউন্সিলরের দায়িত্বে ছিলেন মুহিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালের ৩০ জুন পাকিস্তান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করেন মুহিত। এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি ও সমর্থন আদায়ে নেমে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করে সমর্থন আদায় করতে থাকেন।

এরপর ‘অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে’ কাজ শুরু করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও আইএফএডি-তে। ১৯৮২-৮৩ সালে তখনকার এইচ এম এরশাদ সরকারের সময় প্রথমবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন মুহিত। ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৫ অর্থবছরে দায়িত্ব পালন করে বিদেশে চলে যান তিনি।

১৯৮২-৮৩ সালে তখনকার এইচ এম এরশাদ সরকারের সময়ে প্রথমবারের মতো অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন মুহিত। দীর্ঘদিন বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি পান অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তার কাঁধেই রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোট ১২ বার ও টানা ১০ বার বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণা করার রেকর্ড গড়েন মুহিত।


সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষিত ১২টি বাজেট হলো—

মুহিতের জীবনের প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। যেটা তিনি এরশাদ সরকারের ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

পরের ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ৫ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।

আর তৃতীয় বাজেট ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সরকারে অধীনে ২০০৯-১০ অর্থবছরে। ওই বছর আবুল মাল আবদুল মুহিত ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।

দেশের ৩৯তম ও তার ঘোষিত চতুর্থ বাজেট ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে। ওই বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।

পঞ্চমবারের মতো ২০১১-১২ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষিত বাজেট ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার।

পর্যায়ক্রমে ৬ষ্ঠ বার ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে মুহিত ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।

৭ম বাজেট ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আকার ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।

৮ম বাজেট ছিল ২০১৪-১৫ অর্থবছরের। আবুল মাল আবদুল মুহিত ওই অর্থবছরে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন।

তার জীবনের ৯ম ও দেশের ৪৪তম বাজেট ঘোষণা হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের। যার আকার ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের ১০ম বাজেট ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরের। আকার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪ লাখ ২৭০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন। যা ছিল তার জীবনের ১১তম বাজেট।

তার জীবনের শেষ বাজেট ও দেশে ৪৭তম ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ঘোষিত শেষ বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।

২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজের শেষ কর্মদিবসে এক বিদায়ী অনুষ্ঠানে হাসতে হাসতে তিনি বলেছিলেন, ‘এটি আমার জন্য খুব আনন্দের বিষয়, আমাকে বিদায়-টিদায় করতে হয়নি, আমি নিজে নিজেই বিদায়টা নিয়ে নিয়েছি।’

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ও বাবা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ। মা-বাবা দুইজনই তৎকালীন সিলেট জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তার অবস্থান তৃতীয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তার ছোট ভাই।

মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনীতি নিয়ে ৩০টির অধিক বই লিখেছেন মুহিত। জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুহিতকে ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত করে সরকার।

পাঠকের মন্তব্য