পদ্মা সেতুকে ঘিরে পর্যটনের হাতছানি, গড়ে উঠছে হোটেল-রিসোর্ট

প্রমত্তা পদ্মায় বুক উঁচিয়ে দাড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অহংকার 'পদ্মা সেতু'। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপরই উদ্বোধন হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই সেতুর। শনিবার (২৫ জুন) সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই সেতুর উদ্বোধন করবেন।

এরইমধ্যে পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া অংশে গড়ে উঠছে বিভিন্ন রিসোর্ট-হোটেল-রেস্তোরাঁ। মাওয়াতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিশেষ করে রাজধানী থেকে অনেকেই আসেন পদ্মার তাজা ইলিশের স্বাদ পেতে। তবে, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকে দর্শণার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা পদ্মা সেতু দেখতে ভ্রমণপ্রেমীদের আনাগোনা আরও বেড়েছে। এর ফলে এই অর্থনৈতিক জোনসহ সমৃদ্ধ হচ্ছে পর্যটন শিল্পেও।

সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ হচ্ছে বিনোদনকেন্দ্র, খাবারের দোকান, চা-কফি শপ, খাবার হোটেল ও রেস্তোরাঁ। পদ্মা সেতু লাগোয়া নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল হক কিচেন। হোটেলটির ছাদে বসে ভ্রমণপিপাসুরা খাবারের পাশাপাশি উপভোগ করেন পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য।

হক কিচেন এর ম্যানেজার জামাল হোসেন ইমরান সময় সংবাকে জানান, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে মাওয়াতে অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। আগের চেয়ে এখন দর্শনার্থী বেশি আসে। সপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে অতিথি বেশি আসে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুক্র ও শনিবার দর্শণার্থীর সংখ্যা ছাড়ায় ১০ হাজারের বেশি। সপ্তাহের অন্যদিনও সকাল-বিকেল সেতু এলাকায় ঘুরতে আসেন শত শত মানুষ। মাওয়া ঘাটে সারা রাত ইলিশ খাওয়ার আয়োজন তো থাকেই।

এরইমধ্যে শুধু সেতু ঘুরে দেখা ও ইলিশ খাওয়াসহ একদিনের ট্যুরের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বেশ কয়েকটি ট্যুর এজেন্সি। এ বিষয়ে ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ট্রিয়াব) প্রেসিডেন্ট খবির উদ্দিন আহমেদ সময় সংবাদকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কারণে মাওয়াতে আগের চেয়ে দর্শণার্থী বেড়েছে। আগে শুধু তাজা ইলিশ খেতেই এখানে আসতো, কিন্তু পদ্মা সেতুর কাজ শুরু পর থেকে সেতু দেখতেও অনেকে আসেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি বুকিং পাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, সেতু উদ্বোধনের পর সড়কপথে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না। ঢাকা থেকে সড়কপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যেতে অনেক কম সময় লাগবে। ফলে এসব অঞ্চলে পর্যটনশিল্পে গতি পাবে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

শুধু যে সেতুর উপরের প্রান্তেই জনসমাগম হয় তা নয়, নদীতে ভ্রমণ করার সুযোগও হাতছাড়া করতে চান না দর্শনার্থীরা। সেতু দেখতে অনেকেই বেছে নেন মাওয়া প্রান্তে থাকা বিভিন্ন ধরণের নৌযান। এরমধ্যে ছোট-বড় ট্রলারের পাশাপাশি স্পিডবোটও আছেই। 

স্পিডবোট চালক রিফাত রহমান জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দুপুরের পর থেকে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত যেহেতু সেতু দেখা যায় সেহেতু বিকেলেই দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি থাকে।

তিনি আরও জানান, মাওয়া প্রান্ত থেকে শুধু সেতু দেখতেই প্রতিদিন ৩০টির বেশি স্পিডবোট ছেড়ে যায়। সপ্তাহের অন্যান্য দিন ২-১টা ট্রিপ পেলেও শুক্র ও শনিবার তা ১০ থেকে ১২টা ছাড়িয়ে যায়। তবে বর্তমানে সেতুর নিরাপত্তার স্বার্থে কাছে ঘেঁষতে পারছেন না তারা।

কয়েকজন হকার ও খাবার বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পদ্মা সেতু দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসছেন। এ কারণে ছুটির দিনে তাদের বেচাকেনা দ্বিগুণের বেশি হচ্ছে।

মাওয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভ্রমণপিপাসু এসব মানুষের চাহিদা মেটাতে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের যেন আন্তরিকতার কমতি নেই। আতিথেয়তার সবটুকু দিয়েই পর্যটকদের সেবা দিচ্ছেন তারা। আদি পেশা বদল করে অনেকেই মাওয়া এলাকায় পর্যটনকেন্দ্রিক নতুন ব্যবসা কিংবা অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করছেন।

এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বৃহৎ পরিকল্পনা। পদ্মার দুই পাড়ে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই শহরের আদলে পরিকল্পিতভাবে নতুন শহর গড়ে তোলা হবে। এর সঙ্গে আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি হবে শিল্প-কারখানা। যার মাধ্যমে প্রায় কোটি মানুষের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বিনিয়োগের ১৯ ভাগ রিটার্ন আসবে প্রতিবছর। এর ফলে, পদ্মা সেতুর সঙ্গে দুই পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রাও একেবারে বদলে যাবে।

পাঠকের মন্তব্য