মাত্র ১৫ দিন আগেই আগুন লেগেছিল ওই কারখানায়

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস লিমিটেডে মাত্র পনের দিন আগেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছিল। এরপরও কর্তৃপক্ষ কোন উদ্যোগ নেয়নি।

গত তিন বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করেন জহিরুল ইসলাম। সময় সংবাদকে তিনি  জানান, মাত্র পনের দিন আগে একই ভবনের পঞ্চম তলার আগুন লেগেছিল। তখন তিনি আহত হয়েছিলেন। এখনো সেই পুড়া দাগ আছে বলেও জানান তিনি। 

শ্রমিকদের দাবি, এই কারখানায় অধিকাংশ শিশু শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বয়স ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। 

বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকেলের আগুন শুক্রবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যার পরও বিভিন্ন ফ্লোরে জ্বলছে। এরই মধ্যে কারখানায় ছুটে আসেন কয়েকজন শ্রমিক যারা আগুন লাগার পর ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন। এ সময় লাফিয়ে পড়ার ঘটনা বর্ণনা করেন। জানান, পুরো ভবনে আগুন লাগার পর অতিরিক্ত ধোয়ার কারনে অনেকেই আটকা পড়নে। কয়েকজন ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

এদিকে, এ ঘটনায় শ্রম অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শ্রম প্রতিমন্ত্রী জানান, অগ্নিকান্ডে নিহতদের দুই লাখ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন ত্রুটি থাকলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, আগুনে ওই কারখানার ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত ৫২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪৯ জনের লাশ নিয়ে আসা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে। সবগুলো লাশই পুলিশি পাহারায় আনা হয় বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ছয়তলা ভবনের চতুর্থ তলা পর্যন্ত প্রবেশ করা গেছে। সেখান থেকেই এতোগুলো মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ছয়তলা কারখানা ভবনের উপরের দুই ফ্লোরে এখনো আগুন জ্বলছে। আগুন নেভানোর কাজ চলছে এখনো। ধ্বংসস্তূপে তল্লাশিও এখনো শেষ হয়নি।

বৃহস্পতিবার (০৮ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টায় উপজেলার কর্ণগোপ এলাকার হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার নিচ তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার পর কারখানার ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তখনই তিনজনের মৃত্যু হয়।

এদিকে ঢাকা মেডিকেলে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন নয়জন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন মোরসালিন (২৮) নামের একজন। আর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন বারেক (৪৮), নাহিদ (২৪), মঞ্জুরুল (২৮), আহাদ (৩৮), লিটন (৪৪)। এ ছাড়া এখনো চিকিৎসাধীন তিনজন হলেন হালিমা (১৩), মাজেদা (২৮) ও আমেনা (৪০)।

ওই কারখানায় কিউসি (কোয়ালিটি কন্ট্রোল) ল্যাবের সহকারী হিসেবে কাজ করেন রায়হান আহমেদ। তিনি বলেন, আগুন লাগার পরই ওপর থেকে কয়েকজন লাফিয়ে পড়েন। সেখানে তিন জনের মৃত্য হয়। পরে, কয়েকজন মিলে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়।

এদিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভবনে আটকাপড়ে নিখোঁজ হওয়া শ্রমিকদের উদ্ধারে দেরি হওয়ায় পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। শুক্রবার বেলা ১১টার থেকে থেকে সাড়ে ১১টায় পর্যন্ত প্রায় আধা ঘণ্টা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের ওপর এলোপাতাড়ি ইট-পাটকেল নিক্ষেপসহ ধাওয়া-পাল্টার ঘটনা ঘটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংঘর্ষ চলাকালে কারখানার প্রধান ফটকের সামনে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে তিনটি শর্টগান লুট করে। পরে দুটি উদ্ধার হলেও একটি এখনও উদ্ধার হয়নি।

পাঠকের মন্তব্য