সাজা বেগম, ঘরে রান্না করছিলেন। হঠাৎ ভীতসন্ত্রস্ত মুখ নিয়ে তার ছেলে রান্নাঘরে ঢুকলেন। মায়ের কাছে গিয়ে বলেন, ‘মা, আমাকে সাপে কামড় দিয়েছে। আমি বোধহয় এখনই মারা যাব।’

ছেলের মুখে ‘অলক্ষুণে’ কথা শুনে আঁতকে ওঠে মায়ের মন। রান্না ফেলে মা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন ছেলের জীবন বাঁচাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয় এই মাকে।

সময়মত অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়া, বিষের প্রতিষেধক না দিতে পারায় চিরদিনের জন্য ছেলেকে হারিয়ে ফেলেন সাজা বেগম। দুখিনী এই মা এরজন্য দায়ী করেছেন ভারত সরকার কর্তৃক কাশ্মীরে আরোপিত অবরোধকেই।

ঘটনার দিন ছিল ১৩ আগস্ট। তার ২২ বছর বয়সী ছেলে আমির ফারুক দার। কাশ্মীরে অবরোধের কারণেই তার কলেজ ছিল বন্ধ। তাই ঘরের কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করতেন। সেদিন কাশ্মীরের বারমুল্লা শহরের কাছে তাদের পারিবারিক বাগানে ভেড়া চড়াতে গিয়েছিলেন আমির ফারুক। সেখানেই তাকে কেউটে সাপ (ক্রাইট) কামড়ে দেয়।

কেউটে খুবই বিষাক্ত সাপ। এই সাপে কাটলে প্রথম ৬ ঘণ্টার মধ্যেই ‘পপি ভ্যালেন্ট’ নামক প্রতিষেধক শরীরে নিতে হয়। কিন্তু ১৬ ঘণ্টা চেষ্টা করেও সেদিন সাজা বেগম তার ছেলেকে প্রতিষেধক দিতে পারেন নি। কারণ, সাজা বেগমের জন্য সেদিন সময় ছিল সবচেয়ে বড় শত্রু।

বিষ যাতে দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য ছেলের পায়ে একটি ন্যাকড়া বেঁধে দিয়েছেন সাজা। সময়মত প্রতিষেধক না পেলে কী হবে দু:শ্চিন্তাও আসতে থাকে মনে। এদিকে ছেলের পা ফুলে যেতে শুরু করেছে, মুর্ছা যাচ্ছেন। দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে হলো সাজা বেগমকে। ছেলেকে সাথে নিয়ে উপত্যকার বিপদসংকুল পথ, নিরাপত্তা চৌকি পেরিয়ে চলে যান গ্রামের জনস্বাস্থ্য কার্যালয়ে। সঙ্গে তার স্বামীও ছিলেন। সাধারণত গ্রামের হাসপাতালগুলোতে বিষের প্রতিষেধক পাওয়া যায়। কিন্তু সেদিন ওই কার্যালয় বন্ধ ছিল।

সময় যেতে থাকে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠেন সাজা বেগম। তখন তিনি বারামুল্লা জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য সাহায্যের আশায় চিৎকার শুরু করেন। একপর্যায়ে কোনভাবে বারামুল্লা হাসপাতালে গেলেও সেখানেও পাওয়া যায় নি প্রতিষেধক। বারামুল্লা থেকে ডাক্তাররা একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে ছেলেকে নিয়ে শ্রীনগর হাসপাতালের পথে রওনা হন সাজা বেগম ও তার স্বামী।

কিন্তু শ্রীনগরের পথ ততটা মসৃণ ছিল না। পথে পথে ভারতীয় সৈন্যরা অ্যাম্বুলেন্সটির গতিরোধ করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আমির তখন ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করছিল। শুধু ক্ষীণকণ্ঠে মাকে জানান, তার ডান পা তখন ছিল অনুভূতিহীন।

শ্রীনগর পৌঁছুতে তাদের ২ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়।

প্রতিষেধকের খোঁজে পাহাড়ি পথে কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘযাত্রা, পথে পথে নানা হয়রানি পেরিয়ে একসময় সাজা বেগম ছেলেকে নিয়ে শ্রীনগরের সোউরা হাসপাতালে পৌঁছান। কিন্তু বিধিবাম! সেখানেও মেলে দু:সংবাদ। হাসপাতালে প্রতিষেধক নেই।

এমন সময় খোঁজ আসে বারামুল্লার হাসাপতালে প্রতিষেধক ছিল কিন্তু সেখানকার স্টোররুমে তালা মারা ছিল। স্টোররুমের চাবি যার কাছে ছিল তিনি তখন আশেপাশে ছিলেন না আবার মোবাইল সেবা বন্ধ থাকায় তাকে কলও করা যায় নি।

অজানা আশঙ্কা ঘিরে ধরে মা সাজা বেগমের মনে! ছেলেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি।

বিষের প্রতিষেধকের খোঁজে শ্রীনগরের প্রতিটা ফার্মেসি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন তারা। কিন্তু, নেই, কোথাও নেই! এমনকি খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা একটি সেনা ক্যাম্পে পৌঁছে যান, সেনা ক্যাম্পগুলোতে সাধারণত বিষের প্রতিষেধক থাকে। আগামীকাল আসার কথা বলে তারাও সেদিন মুখ ফিরিয়ে নেন।

 

এদিকে আমিরের অবস্থা আরো করুণ হয়ে ওঠে। প্রতিষেধক খোঁজার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলে কাতর মা সাজা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ‘তুমি সবকিছু বিক্রি করে দেও, কিন্তু আমার ছেলেকে বাঁচাও।’

এ সময় স্ত্রীকে সান্ত্বনা জানিয়ে আশ্বস্ত করতে থাকেন স্বামী। মি.দার জানান, ‘তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম কিন্তু আমার বুকে কেউ যেন ছুরি দিয়ে হানছিল।’

পরের দিন সকাল সাড়ে ১০টা। আমিরকে সাপে কাটার ততক্ষণে ১৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমির চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েন।

সন্তানের মৃতদেহ সঙ্গে নিয়ে ৫৫ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ভগ্ন হৃদয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘরে ফিরে আসে সাজা-দার দম্পতি।

আমিরের মৃত্যুর দুইদিন পর ১৫০ মাইল দূরের একটি শহর থেকে শ্রীনগরের হাসপাতালে বিষের প্রতিষেধক পৌঁছেছিল। অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে সেদিন ৩০ শিশি (কাচের ছোট বোতল) প্রতিষেধক আনা হয়েছিল।

কাশ্মীরে চিকিৎসা পরিস্থিরি গুরুতর অবনতি

কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন তুলে নেওয়ার দুইমাস পেরিয়েছে। চলতি বছরের ৫ আগস্ট ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে অঞ্চলটিকে দুই ভাগ করে অবোরোধ চাপিয়ে দেয় ভারতের কেন্দ্রিয় সরকার। ওই দিন সকাল থেকে কার্যত অচলাবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত হয় ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীর উপত্যকা। আর এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন অসুস্থ রোগীরা।

উপত্যকার ডাক্তারদের মত, যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় বহু মানুষের জীবন চলে গেছে দুই মাসে। যারা জীবিত আছেন তারাও দুর্বিষহ জীবন পার করছেন। তার একটাই কারণ যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা। উপত্যকার ইন্টারনেট পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

যার কারণে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী, যিনি হয়ত অনলাইন থেকে ওষুধ ক্রয় করতেন, তিনিও সেটা পারছেন না।

মোবাইল সেবা বন্ধ থাকায় ডাক্তাররাও নিজেদের মধ্যে যোগযোগ করতে পারছেনা, জীবণমরণ সন্ধি:ক্ষণে থাকা রোগীর জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গে পরামর্শ করাও সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বেশিরভাগ কাশ্মীরিও যেহেতু ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার করেন না তারাও অনেকটা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন।

কাশ্মীর হাসপাতালের চিকিৎসক সাদাত। ভয়ের সংস্কৃতি থেকে হোক কিংবা অন্যকারণে নিজের পুরা নাম তিনি প্রকাশ করতে চান না। নিউইয়র্ক টাইমকে তিনি বলেন, সময় মত অ্যাম্বুলেন্স না ডাকতে পারার জন্য কয়েক ডজন রোগী মারা গেছেন এই কয়দিনে, যাদের বেশিরভাগই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিল।

তবে ডাক্তারদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারতীয় কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। এমনকি এই অবরোধের সময়ও কোন অসুবিধা নাই উপত্যকায়। নিরাপত্তা চৌকিগুলো পার হতে স্বাস্থ্যকর্মী ও গুরুতর রোগীদের পাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এমনি মানবেতর পরিস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনা করে কাশ্মীরের কারফিউ তুলে নিতে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছে ভারতীয় এক দল চিকিৎসক। তাদের একজন রামানি আতকুড়ি। তিনি বলেন, ‘মানুষ মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র মোবাইল সেবা না থাকার কারণে। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় অনেকে অ্যাম্বুলেন্সও ডাকতে পারছেন না।’

`সেভ হার্ট ইনিশিয়েটিভ’ হৃদরোগের ডাক্তার নিয়ে গড়ে ওঠা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। ইতোমধ্যে তারা ১৩ হাজার হৃদরোগীর জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে অনন্য নজির রেখেছে। সেই গ্রুপে কাশ্মীরের ডাক্তার যেমন আছে তেমনি আছে আমেরিকান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরাও। গ্রুপেই ডাক্তাররা কোন রোগীর ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম শেয়ার করে কিংবা জরুরি তথ্য বিনিময় করে জটিল রোগের চিকিৎসায় নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে থাকেন। যা অনেকসময় রোগীর জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এই মুহূর্তে কাশ্মীর উপত্যকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় ডাক্তাররা সেটিও ব্যবহার করতে পারছেন না।

কাশ্মীরের অন্যতম বড় শহর শ্রীনগরের শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গত দুই মাসের অবরোধ সেই সাথে ওষুধের স্বল্পতার জন্য হাসপাতালে অস্ত্রপোচার প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, অবরোধের কারণে শিশু রোগের চিকিৎসা ও মাতৃত্বকালীন সেবা দেওয়াটা সবচেয়ে বেশি দু:সাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতমাসে রাজিয়া খান নামের এক নারীর গর্ভকালীন জটিলতা দেখা দেয়। কিন্তু তার বাড়ি থেকে নিকটবর্তী হাসপাতালের দুরত্ব ছিল ৭ মাইল। মোবাইল সেবা না থাকায় সেদিন তিনি অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে পারেন নি। পরে বাধ্য হয়ে তারা কয়েকঘণ্টায় সাত মাইল হেঁটে হাসপাতালে পৌছান। কিন্তু সে হাসপাতালে কোন চিকিৎসা না পেয়ে তাদের শ্রীনগরে পাঠানো হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। গর্ভের সন্তান নষ্ট হয় রাজিয়ার।

রাজিয়ার স্বামী বিলাল মান্ডু বলেন, যদি সেদিন মোবাইল সেবা চালু থাকত তাহলে হয়ত সঠিক সময়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স আমরা ডাকতে পারতাম।

SHARE