*হার্ডিঞ্জ ব্রিজে বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত * নবাবগঞ্জে ভাঙন আতঙ্ক * শিবগঞ্জে গোখাদ্য নিয়ে বিপাকে * মধুখালীতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

ফারাক্কার গেট খুলে দেয়ায় উজান থেকে নেমে আসা বানের পানিতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত আছে। গঙ্গা ও পদ্মা এবং এর শাখা নদীগুলোয় পানি বাড়ছে। এরই মধ্যে দেশের ১০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।

জেলাগুলো হচ্ছে- রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জ। বানের পানির কারণে উল্লিখিত জেলার নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়ে নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় অনেকে গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে উঁচু স্থানে ঠাঁই নিয়েছেন।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অক্টোবরের এই বন্যা নজিরবিহীন। এর আগে সেপ্টেম্বরে বন্যা শুরু হয়ে তা অক্টোবরে গড়াত। কিন্তু অক্টোবরে এই বন্যার একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। এবার মৌসুমের আগমন ছিল প্রলম্বিত।

এ কারণে ভয়াবহ দাবদাহ আর খরতাপে পুড়তে হয়েছিল। আগমনীর মতো মৌসুমের প্রস্থানও বিলম্বিত। যেখানে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে মৌসুমের উপকূল পার হওয়ার কথা মৌসুমি বায়ুর, সেখানে চলতি পুরো মাসই এই বায়ুর প্রভাব থাকতে পারে। মূলত মৌসুমি বায়ুর দাপটের কারণেই অসময়ে ভারি বৃষ্টি থেকে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে বাংলাদেশের বন্যার আরেক উৎস ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকায় বড় বন্যার আশঙ্কা নেই। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গঙ্গা-পদ্মা ছাড়া দেশের সব নদনদীর সমতল কমছে। এই দুই নদীর সমতল ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং সুরমা ও কুশিয়ারা নদ-নদীগুলোর পানি হ্রাস পেতে পারে।

তবে গঙ্গা-পদ্মায় বন্যার কারণে চার নদীর পানি বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে- গঙ্গা, পদ্মা, গড়াই ও মেঘনা। এর মধ্যে কুমারখালীতে গড়াই নদীর পানি বিপদসীমা সবচেয়ে উপরে বইছে। ওই পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটারের উপরে আছে পানি।

আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি) বলেছে, চলমান ভারি বৃষ্টির পরিস্থিতি প্রায় সারা দেশেই বিরাজ করছে। মৌসুমি বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে।

শুক্রবারও রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে। আগামী ৫ দিনেও এই পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো পূর্বাভাস নেই। যুগান্তর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

ঈশ্বরদী (পাবনা) : পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম জহুরুল হক জানান, বৃহস্পতিবার সকালে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা রয়েছে ১৪ দশমিক ৩৩ সেমি., বিপদসীমা ১৪ দশমিক ২৫ সেমি.। পানির স্রোত প্রবল।

এ কারণে ঈশ্বরদী ও নদীর অপরপারের ভেড়ামারা অঞ্চলের নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়ে বন্যার রূপ নিয়েছে। সেই সঙ্গে তলিয়ে গেছে চরে আবাদকৃত শত শত বিঘার ফসল। ফারাক্কার কুপ্রভাবে যেমন শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায় পদ্মাসহ শাখা নদীগুলো; তেমনি এই সময় হঠাৎ করে ফারাক্কার সব স্লুইসগেট খুলে দেয়ায় প্রবল গতিতে পদ্মায় পানি বাড়ছে। স্রোতের তোড়ে ঈশ্বরদী উপজেলার নদী তীরবর্তী বেশ কিছু এলাকার এক হাজার হেক্টর জমির সবজি-ফসল ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। আরসাঁড়া, পাকশী ও লক্ষীকুণ্ডা ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার আগে থেকেই জেলা প্রশাসন সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নদীরপাড় এলাকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যখন যেভাবে প্রয়োজন পাবনা জেলা প্রশাসন তখন সেখানে সেভাবেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

নবাবগঞ্জ (ঢাকা) : পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকার নবাবগঞ্জের বান্দুরা ইউনিয়নের হযরতপুর, সাদাপুর ও সৈয়দপুর এলাকায় ভাঙন কবলে পড়েছে প্রায় ৫০টি পরিবার। এসব গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়রতপুর খালের ভাঙনের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারছেন না গ্রামের বাসিন্দারা। তারা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

গত কয়েক দিনে পদ্মার পানি হঠাৎ পানি বৃদ্ধির ফলে হযরতপুর-সৈয়দপুর এলাকায় খালের পাড়ে অবস্থিত বসতবাড়িগুলো ভাঙনের কবলে পড়েছে। এতে গত তিন দিনে ৫টি বসতবাড়ি ও গাছপালা খালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ার কারণে এসব পরিবারের সদস্যরা খোলা আকাশের নিচে রাতদিন অতিবাহিত করছেন।

ভাঙনকবলিত এসব পরিবার এখনও কোনো সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা থেকে সহযোগিতা পায়নি বলে জানায়। নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচএম সালাউদ্দিন মনজু বলেন, কিছুদিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা খালটি পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন। ভাঙনকবলিত এলাকা আমরা প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নিচ্ছি।

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : শিবগঞ্জের পদ্মায় বন্যার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি হয়নি বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে। তবে শিবগঞ্জ উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান। উপজেলার মনাকষা, দুর্লভপুর, পাকা, উজিরপুর, ঘোড়াপাখিয়া, ছত্রাজিতপুর ও বিনোদপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাকা ইউনিয়নের মানুষ।

মধুখালী (ফরিদপুর) : মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ১০ গ্রামের প্রায় ৩০ পরিবার নদী ভাঙনের মুখে এবং প্রায় ৩৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে গ্রামগুলো প্লাবিত হওয়ায় ওই এলাকার কৃষকদের ৬৫ হেক্টর রোপা আমন ধানের ক্ষতি হয়েছে। মধুখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোস্তফা মনোয়ার নদী ভাঙন ও বন্যা কবলিত পানিবন্দি এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

SHARE